হাইকোর্টে আপনার অধিকার ও প্রতিকার: অনুচ্ছেদ ৪২- সম্পত্তির অধিকার (পর্ব- ১৭)

আপনি কি জানেন সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদের (সম্পত্তির অধিকার) অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে আপনার কী কী মৌলিক অধিকার ও প্রতিকার রয়েছে? আপনি কি জানেন আপনার সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করার জন্য হাইকোর্ট সর্বদা আপনার পাশে আছে? যখন কোনো কর্তৃপক্ষ আপনার সম্পত্তির অধিকার লঙ্ঘন করে, তখন আপনি কী করতে পারেন সে সম্পর্কে আপনার কি ধারণা আছে? আপনি যখন সম্পত্তির অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন, তখন আপনার আইনি প্রতিকার বা সমাধান কী? যদি জানা না থাকে, তবে এই লেখাটি আপনাকে ৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে আপনার অধিকার ও প্রতিকারগুলো জানতে সাহায্য করবে। কোনো কর্তৃপক্ষ সম্পত্তির অধিকার লঙ্ঘন করলে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদ সম্পত্তির অধিকারকে সুরক্ষা প্রদান করে। এটি জনস্বার্থে ব্যক্তিগত সম্পত্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ক্ষমতার বিপরীতে একজন ব্যক্তির সম্পত্তি মালিকানা এবং তা পরিচালনার অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। ৪২ অনুচ্ছেদ নাগরিকদের জন্য সুরক্ষার দুটি প্রাথমিক স্তর প্রদান করে: ১) ৪২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, "আইনের কর্তৃত্ব" ব্যতীত কোনো সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে অর্জন, জাতীয়করণ বা হুকুমদখল (Requisition) করা যাবে না। এর অর্থ হলো সরকার কেবল একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জমি দখল করতে পারে না; তাকে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট আইন (যেমন: স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭) অনুসরণ করতে হবে। ২) ৪২(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধিগ্রহণের বিধান সম্বলিত যেকোনো আইনে অবশ্যই ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে হয় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে অথবা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও প্রদানের নীতিসমূহ সুনির্দিষ্ট করতে হবে। যখন রাষ্ট্র, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা সরকারি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে নিশ্চিতকৃত সম্পত্তির অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তখন সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা যেতে পারে।

সাংবিধানিক বিধান:
বাংলাদেশ সংবিধানের ৪২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর বা অন্যভাবে বিলি-ব্যবস্থা করার অধিকার থাকবে। তবে রাষ্ট্র কেবল আইনের কর্তৃত্বেই বাধ্যতামূলকভাবে সম্পত্তি অর্জন, জাতীয়করণ বা হুকুমদখল করতে পারবে।
বাংলাদেশ সংবিধানের ৪২(২) অনুচ্ছেদ নিশ্চিত করে যে, অধিগ্রহণ বা হুকুমদখলের অনুমোদন প্রদানকারী যেকোনো আইনে অবশ্যই ক্ষতিপূরণের বিধান থাকতে হবে এবং ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বা তা নির্ধারণের নীতিসমূহ নির্দিষ্ট থাকতে হবে।

৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট পিটিশন দায়েরের বিষয় ও ভিত্তিগুলো:

আইনের কর্তৃত্ব ছাড়া সম্পত্তি অধিগ্রহণ:
ইস্যু: রাষ্ট্র আইনি কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো সম্পত্তি অধিগ্রহণ করতে পারে না।
রিটের ভিত্তি: যখন সরকারি কর্তৃপক্ষ বিধিবদ্ধ আইনের কর্তৃত্ব ছাড়াই ব্যক্তিগত সম্পত্তি অধিগ্রহণ বা দখল করে, অথবা অধিগ্রহণ আইন অনুসরণ না করে সরকার জমি গ্রহণ করে।
উদাহরণ: স্থানীয় প্রশাসন বৈধ অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু না করেই ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে একটি সরকারি রাস্তা নির্মাণ করল।
বিচারিক নজির: 'ফজলুর রহমান' মামলায় বলা হয়েছে, আইনি কর্তৃত্ব এবং সঠিক প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো সম্পত্তি গ্রহণ করা যাবে না।

ক্ষতিপূরণ ছাড়া সম্পত্তি অধিগ্রহণ:
অধিগ্রহণ বলতে জনস্বার্থে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির স্থায়ী মালিকানা গ্রহণকে বোঝায়। জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের জন্য ব্যক্তিগত জমি নেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে।
ইস্যু: ৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে সম্পত্তি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা আবশ্যক। যদি রাষ্ট্র জমি দখল করে কিন্তু ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ বা প্রদানে ব্যর্থ হয়, তবে কর্তৃপক্ষকে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা যেতে পারে।
রিটের ভিত্তি: যখন ১) ক্ষতিপূরণ প্রদান ছাড়াই সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হয়, ২) কর্তৃপক্ষ অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদানে বিলম্ব করে, এবং ৩) আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয় না।
উদাহরণ: সরকার মহাসড়ক প্রকল্পের জন্য কৃষিজমি অধিগ্রহণ করল কিন্তু জমির মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলো।

আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সম্পত্তি হুকুমদখল (Requisition):
ইস্যু: হুকুমদখল বলতে জনস্বার্থে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সাময়িকভাবে কোনো সম্পত্তি গ্রহণ করাকে বোঝায়। যদি সরকার বা কোনো সরকারি সংস্থা বাধ্যতামূলক আইনি ধাপগুলো অনুসরণ না করে আপনার জমি বা ভবন দখল করে, তবে তা আপনার মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।
রিটের ভিত্তি: যখন বৈধ আদেশ ছাড়াই সম্পত্তি হুকুমদখল করা হয় অথবা কর্তৃপক্ষ আইনি সীমার বাইরেও দখল বজায় রাখে।
উদাহরণ: একটি ব্যক্তিগত ভবন সরকারি অফিসের কাজের জন্য হুকুমদখল করা হলো, কিন্তু হুকুমদখলের মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক পরেও সেটি সরকারি নিয়ন্ত্রণেই রয়ে গেল।
বিচারিক নজির: 'আব্দুল জলিল' মামলায় আদালত রায় দিয়েছেন যে, হুকুমদখলের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিধিবদ্ধ প্রয়োজনীয় শর্তগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

সম্পত্তির অধিকারের স্বেচ্ছাচারী বাতিলকরণ:
ইস্যু: কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছাচারীভাবে সম্পত্তির মালিকানায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
রিটের ভিত্তি: যখন কর্তৃপক্ষ আইনি কর্তৃত্ব ছাড়াই জমির মালিকানা বা লিজ বাতিল করে, অথবা সরকারি কর্মকর্তারা সম্পত্তির বৈধ দখলে হস্তক্ষেপ করেন।
উদাহরণ: একটি সরকারি দপ্তর কোনো নোটিশ বা শুনানির সুযোগ ছাড়াই জমির দীর্ঘমেয়াদী লিজ বাতিল করল।

সম্পত্তি হস্তান্তর বা বিলি-ব্যবস্থায় স্বেচ্ছাচারী হস্তক্ষেপ:
ইস্যু: ৪২ অনুচ্ছেদ সম্পত্তি হস্তান্তর বা বিলি-ব্যবস্থা করার অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। এ ধরনের হস্তক্ষেপ ৪২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
রিটের ভিত্তি: যখন কর্তৃপক্ষ বেআইনিভাবে সম্পত্তি বিক্রয় বা হস্তান্তরে বাধা দেয়, অথবা সরকার আইন বহির্ভূত বাধানিষেধ আরোপ করে।
উদাহরণ: একজন জমির মালিক সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইছেন কিন্তু কর্তৃপক্ষ কোনো আইনি কারণ ছাড়াই দলিল নিবন্ধনে (Registration) অস্বীকৃতি জানাল।

সরকারি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ব্যক্তিগত সম্পত্তির অবৈধ দখল:
ইস্যু: বৈধ অধিগ্রহণ বা হুকুমদখল ছাড়া সরকারি কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিগত সম্পত্তি দখল করতে পারে না। আদালত দখল পুনরুদ্ধার বা ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন।
রিটের ভিত্তি: যখন সরকারি কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে ব্যক্তিগত জমি দখল করে অথবা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই সরকারি প্রকল্পে জমি ব্যবহার করা হয়।
উদাহরণ: একটি সরকারি সংস্থা কোনো অধিগ্রহণ বা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে ড্রেনেজ সিস্টেম নির্মাণ করল।

উপসংহার:
রিট পিটিশন দায়ের করা যেতে পারে যখন—আইনি কর্তৃত্ব ছাড়া সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হয়, ক্ষতিপূরণ বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া অধিগ্রহণ ঘটে, বেআইনিভাবে সম্পত্তি হুকুমদখল করা হয়, কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছাচারীভাবে সম্পত্তির অধিকারে হস্তক্ষেপ বা তা বাতিল করে, আইনি কর্তৃত্ব ছাড়া জাতীয়করণ করা হয়, সরকার বেআইনিভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর বা বিলি-ব্যবস্থায় বাধা দেয় অথবা সরকারি কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তি দখল করে।

মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
ফোন: +৮৮০১৯৭১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com