হাইকোর্টে আপনার অধিকার ও প্রতিকার: অনুচ্ছেদ ৩৫- বিচার ও দন্ড সম্পর্কে রক্ষণ (পর্ব- ১৩)


বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ “বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষণ” নিশ্চিত করে।  যদি কোনো কর্তৃপক্ষ, আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা সরকারি সংস্থা এই সুরক্ষাগুলো লঙ্ঘন করে, তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে একটি রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন।

৩৫ অনুচ্ছেদ ব্যক্তিকে অন্যায্য ফৌজদারি মামলা, অবৈধ দণ্ড, ভূতাপেক্ষ ফৌজদারি দায়বদ্ধতা (Retrospective Liability), double jeopardy (একই অপরাধে দুইবার বিচার) এবং নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা থেকে সুরক্ষা দেয়। নিচে ৩৫ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট পিটিশন দায়েরের প্রধান বিষয় এবং ভিত্তিগুলো উদাহরণ ও বিচারিক নজিরসহ আলোচনা করা হলো।

স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও ন্যায্য বিচার বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া (Due Process):
ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার একটি নিরঙ্কুশ অধিকার। ৩৫ অনুচ্ছেদের অধীনে একটি "ন্যায্য বিচার" কতগুলো অলঙ্ঘনীয় উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এর কোনো একটির অভাব থাকলে বিচারটিকে coram non-judice (বিচারকবিহীন বা আইনি এখতিয়ারহীন) বা অসাংবিধানিক হিসেবে গণ্য করা হয়। যদি বিচারকের স্বার্থের সংঘাত থাকে বা নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ করে, তবে সেই বিচার ন্যায্য হতে পারে না।

রিটের ভিত্তি: যখন অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে বিচার করা হয়, আইনি পদ্ধতি লঙ্ঘন করে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়, আদালত পক্ষপাতমূলক আচরণ করে, অথবা সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ না দিয়ে দণ্ড প্রদান করা হয়, তখন রিট করা যেতে পারে।

রিটের ভিত্তি: বিশেষ ট্রাইব্যুনালের গঠনকে চ্যালেঞ্জ করা অথবা পক্ষপাতের যুক্তিসঙ্গত আশঙ্কা থাকলে মামলা স্থানান্তরের আবেদন করা।

শুনানির অধিকার (Audi Alteram Partem):
কাউকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। এর মধ্যে সাক্ষীদের জেরা করা এবং প্রতিরক্ষা উপস্থাপনের অধিকার অন্তর্ভুক্ত।

রিটের ভিত্তি: যদি আদালত prematurely আসামিপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ করে দেয় বা কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে সাক্ষ্য দিতে দিতে অস্বীকার করে।

যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া (Due Process):
যদি কোনো আইন পুলিশকে গ্রেফতারের কারণ না জানিয়ে কাউকে গ্রেফতার করার অনুমতি দেয়, তবে সেই আইনটি নিজেই 'ডিউ প্রসেস' বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন। বিচারিক রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, পদ্ধতিগত ন্যায্যতা ন্যায্য বিচারের অধিকারের একটি অংশ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে রাষ্ট্রকে অবশ্যই "সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা" প্রদান করতে হবে।

দ্রুত বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া (অনুচ্ছেদ ৩৫(৩)):
আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তির রয়েছে।

রিটের ভিত্তি: যদি ফৌজদারি কার্যক্রম বছরের পর বছর অযৌক্তিকভাবে বিলম্বিত হয়, কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করে তদন্ত বা বিচারে দেরি করে, অথবা বিচারটি কোনো পক্ষপাতদুষ্ট বা পরাধীন ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

উদাহরণ: একটি ফৌজদারি মামলা ১৫ বছর বা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো অগ্রগতি ছাড়াই ঝুলে আছে, যা অভিযুক্তের প্রতি অবিচার সৃষ্টি করছে।

দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার [অনুচ্ছেদ ৩৫(৩)]:
এই অধিকার গ্যারান্টি দেয় যে, প্রতিটি অভিযুক্ত ব্যক্তি আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে এবং প্রকাশ্য বিচার পাবেন।

রিটের ভিত্তি: দীর্ঘসূত্রতা ও অযৌক্তিক বিলম্বের শিকার কোনো বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টের নির্দেশনা চাওয়া।

উদাহরণ: একজন অভিযুক্ত ৮ বছর ধরে বিচারাধীন বন্দী হিসেবে জেলে আছেন এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার সময় নেওয়ার কারণে এখনও সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়নি। এক্ষেত্রে দ্রুত বিচারের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ায় হাইকোর্টে রিট করা যেতে পারে।

বিচারিক নজির: বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করেছে যে, বিচারে অযৌক্তিক বিলম্ব মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। বিভিন্ন জনস্বার্থ মামলায় আদালত নিম্ন আদালতকে পুরনো মামলাগুলো অগ্রাধিকার দিতে এবং বিচার কাজ অপ্রয়োজনে বিলম্বিত না করতে নির্দেশনা দিয়েছেন, উল্লেখ করেছেন যে "বিলম্বে বিচার মানেই বিচারের অস্বীকার" (justice delayed is justice denied)।

আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয় এমন আদালত বা ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার (অনুচ্ছেদ ৩৫(৩)):
সাংবিধানিক নীতি: বিচার অবশ্যই আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে।

রিটের ভিত্তি: যখন কোনো ট্রাইব্যুনালের আইনি এখতিয়ার থাকে না, আইনিভাবে গঠিত নয় এমন কোনো সংস্থা ফৌজদারি বিচার পরিচালনা করে অথবা নির্বাহী কর্তৃপক্ষ বিচারিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে।

উদাহরণ: যদি নির্বাহী আদেশে গঠিত কোনো বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সংবিধিবদ্ধ আইনি ক্ষমতা ছাড়াই ফৌজদারি বিচার করে। সংবিধান বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, যা ন্যায্য বিচারের জন্য অপরিহার্য।

আইনি এখতিয়ারহীন ট্রাইব্যুনালের বিচার:
যদি কোনো ব্যক্তি এমন ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষ দ্বারা বিচারপ্রাপ্ত হন যার কোনো আইনি এখতিয়ার নেই, অথবা যদি ট্রাইব্যুনাল সাংবিধানিক বা পদ্ধতিগত সুরক্ষা লঙ্ঘন করে, তবে রিট করা যেতে পারে। বিচারিক প্রক্রিয়া অবশ্যই সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

DOUBLE JEOPARDY বা একই অপরাধে দুইবার বিচারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা (অনুচ্ছেদ ৩৫(২)):
সাংবিধানিক নীতি: ৩৫(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: "একই অপরাধের জন্য কোন ব্যক্তিকে একাধিকবার ফৌজদারীতে সোপর্দ ও দণ্ডিত করা যাইবে না।"
Double Jeopardy এর শর্তাবলী:
১) পূর্ববর্তী বিচার: ব্যক্তিকে আগে কোনো আদালতে বিচার করা হয়ে থাকতে হবে।
২) দণ্ড: ব্যক্তিকে দণ্ডিত হতে হবে (অথবা চূড়ান্তভাবে খালাস পেতে হবে, যদিও ৩৫(২) এর ভাষ্যে "সোপর্দ ও দণ্ডিত" এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে)।
৩) একই অপরাধ: দ্বিতীয় মামলাটি অবশ্যই একই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এবং একই অপরাধের জন্য হতে হবে।

রিটের ভিত্তি: যখন কর্তৃপক্ষ একই অপরাধের ভিত্তিতে একাধিক মামলা দায়ের করে। ইতিমধ্যে দণ্ডিত বা খালাসপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে পুনরায় একই ঘটনায় বিচার করা হলে 'রিট অফ সার্টিওরারি' বা 'ম্যানডামাস' এর মাধ্যমে তা চ্যালেঞ্জ করা যায়।

উদাহরণ: জালিয়াতির একটি মামলায় একজন খালাস পেলেন, কিন্তু কর্তৃপক্ষ হুবহু একই অভিযোগে আরেকটি মামলা দায়ের করল। অথবা দণ্ডবিধির অধীনে "আঘাত করার" জন্য একজনকে দণ্ড দেওয়া হলো এবং পরে একই ঘটনার ভিত্তিতে তাকে আবার "হত্যার চেষ্টা"র জন্য বিচারের চেষ্টা করা হলো।

বিচারিক নজির: 'আব্দুল হাকিম' মামলায় আদালত বলেছেন যে, একই অপরাধের জন্য দ্বিতীয়বার বিচার করা অসাংবিধানিক।

আইনি অবস্থান: যদি প্রথম "বিচার"টি আইনত বাতিল বা অকার্যকর হয়ে থাকে, তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি কারিগরিভাবে কখনো "ঝুঁকিতে" ছিলেন না। সেক্ষেত্রে একটি উপযুক্ত আদালতে দ্বিতীয়বার বিচার করা বৈধ হতে পারে। ৩৫(২) এর সুরক্ষা তখনই পাওয়া যায় যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি একইসাথে বিচারের সম্মুখীন এবং দণ্ডিত হয়েছেন। যদি প্রথম বিচারটি শুধুমাত্র 'ডিসচার্জ' বা অব্যাহতি (চূড়ান্ত খালাস বা দণ্ড নয়) এর মাধ্যমে শেষ হয়, তবে দ্বিতীয়বার বিচার শুরু করা যেতে পারে।

RETROSPECTIVE (Ex Post Facto Law) বা ভূতাপেক্ষ আইনের অধীনে দণ্ড:
এই ধারা ফৌজদারি আইনের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ নিষিদ্ধ করে। কোনো কাজ করার সময় যদি তা অপরাধ না হয়ে থাকে, তবে পরবর্তী কোনো আইনের মাধ্যমে সেই কাজের জন্য কাউকে দণ্ডিত করা যাবে না। এছাড়া অপরাধ করার সময় যে দণ্ড প্রচলিত ছিল, তার চেয়ে বেশি দণ্ড দেওয়া যাবে না।

সাংবিধানিক সুরক্ষা: ৩৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অপরাধ সংগঠনের সময় বলবৎ ছিল এমন আইন লঙ্ঘন ছাড়া কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না এবং তৎকালীন নির্ধারিত দণ্ডের চেয়ে বেশি দণ্ড আরোপ করা যাবে না।

রিটের ভিত্তি: অতীতে করা কোনো কাজকে অপরাধ সাব্যস্ত করে নতুন প্রণীত বা সংশোধিত আইনের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করা অথবা তৎকালীন দণ্ডের চেয়ে কঠোর দণ্ডকে চ্যালেঞ্জ করা।

উদাহরণ: ২০২৬ সালে প্রণীত একটি আইন কোনো কাজকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করল, কিন্তু একজনকে ২০২৩ সালে সেই কাজ করার জন্য বিচার করা হচ্ছে।

উদাহরণ: ২০২৩ সালে একটি অপরাধের সাজা ছিল ৫ বছর। ২০২৪ সালে আইন সংশোধন করে সাজা ১০ বছর করা হলো। ২০২৫ সালে নতুন আইনের ভিত্তিতে কাউকে ১০ বছর সাজা দিলে ৩৫(১) অনুচ্ছেদের অধীনে সেই বর্ধিত সাজা বাতিলের জন্য রিট করা যেতে পারে।

বিচারিক নজির: 'কাজী এম রহমান' মামলায় হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন যে, ফৌজদারি দায়বদ্ধতা ভূতাপেক্ষভাবে আরোপ করা যাবে না এবং এটি ৩৫(১) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। BLAST মামলায় হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত নতুন আইনের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগের ক্ষেত্রে একই নীতি বজায় রেখেছেন।

যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া দণ্ড:
যদিও ৩৫ অনুচ্ছেদ মূলত ফৌজদারি কার্যপ্রণালী নিয়ে কাজ করে, তবুও যেকোনো দণ্ড অবশ্যই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

রিটের ভিত্তি: আইনানুগ বিচার ছাড়া কাউকে দণ্ড দিলে অথবা এখতিয়ারহীন কর্তৃপক্ষ জরিমানা বা দণ্ড আরোপ করলে।

উদাহরণ: কোনো প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কোনো আইনি প্রক্রিয়া বা আদালতের আদেশ ছাড়াই কাউকে শাস্তি প্রদান করল।

উপসংহার:
যদি অপরাধ সংগঠনের সময় প্রচলিত আইন লঙ্ঘন ছাড়া কাউকে দণ্ডিত করা হয়, প্রচলিত দণ্ডের চেয়ে বেশি দণ্ড দেওয়া হয়, ফৌজদারি আইন ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হয়, ডাবল জিওপার্ডি বা একই অপরাধে দুইবার বিচারের সম্মুখীন করা হয়, দ্রুত বিচার অস্বীকার করা হয়, আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয় এমন ট্রাইব্যুনাল দ্বারা বিচার করা হয়, নির্যাতন বা অবমাননাকর শাস্তি দেওয়া হয় অথবা যথাযথ এখতিয়ার ছাড়া দণ্ড আরোপ করা হয়—তবে রিট পিটিশন দায়ের করা যেতে পারে। ৩৫ অনুচ্ছেদের বিভিন্ন দফার মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায্য ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা বা নির্যাতনের হাত থেকে সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে।


মোঃ কামরুজ্জামান

অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।
যোগাযোগ: +৮৮০১৯৭১৯৯৩৬৩৯
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com