হাইকোর্টে আপনার অধিকার ও প্রতিকার: অনুচ্ছেদ ৩৩- গ্রেপ্তার ও আটক সম্পর্কে রক্ষাকবচ (পর্ব- ১২)


গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো নাগরিককে গ্রেপ্তার বা আটক করা হলে তাকে নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতিগত রক্ষাকবচ প্রদান করা হয়েছে। পুলিশ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ যখন এই রক্ষাকবচগুলো লঙ্ঘন করে, তখন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি উপযুক্ত প্রতিকার (যেমন: হেবিয়াস কর্পাস বা বন্দি প্রদর্শন রিট, ম্যান্ডামাস, ঘোষণা ইত্যাদি) চেয়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে একটি রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন।

৩৩ অনুচ্ছেদ মূলত একজন ব্যক্তিকে যথেচ্ছ গ্রেপ্তার, বেআইনি আটক এবং নিবর্তনমূলক আটক (Preventive Detention) ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে সুরক্ষা দেয়। নিচে সেই প্রধান বিষয় এবং ক্ষেত্রগুলো আলোচনা করা হলো যার ভিত্তিতে রিট পিটিশন দায়ের করা যেতে পারে:

১. গ্রেপ্তারের কারণ না জানিয়ে গ্রেপ্তার:
সাংবিধানিক বিধান: অনুচ্ছেদ ৩৩(১) অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে যথাসম্ভব দ্রুত গ্রেপ্তারের কারণ না জানিয়ে আটক রাখা যাবে না।

কখন রিট করা যাবে: যদি পুলিশ বা কোনো কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তারের কারণ না জানায়, অস্পষ্ট বা মিথ্যা কারণ দেখায় অথবা গোপনে আটক রাখে, তবে রিট করা যাবে।

উদাহরণ: পুলিশ রাতে কোনো রাজনৈতিক কর্মী বা ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে গেল কিন্তু কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা জানালো না।

উদাহরণ: মধ্যরাতে একজনকে বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হলো, কিন্তু কোনো পরোয়ানা দেখানো হলো না বা কোন আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে তা বলা হলো না। ১০ ঘণ্টা পার হওয়ার পরও পরিবার জানে না তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী।

আইনি পদক্ষেপ: ৩৩(১) অনুচ্ছেদের বাধ্যতামূলক শর্ত "কারণ জানানো" লঙ্ঘন করা হয়েছে এই মর্মে আটকাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করতে রিট করা যায়।

বিচার বিভাগীয় নজির: 'ব্লাস্ট' (BLAST) মামলায় প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—গ্রেপ্তারকারী কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে কারণ জানাতে হবে। যথেচ্ছ গ্রেপ্তার সংবিধানের ৩১, ৩২ এবং ৩৩ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। এই মামলায় পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের ওপর নির্দেশিকা প্রদান করা হয়েছে।

২. আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করার অধিকার খর্ব করা:
সাংবিধানিক বিধান: অনুচ্ছেদ ৩৩(১) নিশ্চিত করে যে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির নিজের পছন্দমতো আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করার এবং তার মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থাকবে।

কখন রিট করা যাবে: যদি পুলিশ আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করতে বাধা দেয়, ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করে বা আইনজীবীর উপস্থিতি ছাড়াই জিজ্ঞাসাবাদ করে, তবে হাইকোর্ট বিভাগে রিট করা যাবে।

উদাহরণ: দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি আইনজীবীর সাথে দেখা করতে চাইলে পুলিশ কয়েকদিন ধরে তা প্রত্যাখ্যান বা বিলম্বিত করছে।

বিচার বিভাগীয় নজির: 'অরুনা সেন' মামলায় বলা হয়েছে, আইনি পরামর্শের সুযোগ না দেওয়া ৩৩ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। আদালত আটকের সময় আইনি প্রতিনিধিত্বের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।

৩. ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে ব্যর্থতা:
সাংবিধানিক বিধান: অনুচ্ছেদ ৩৩(২) অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে (যাত্রার প্রয়োজনীয় সময় ব্যতিরেকে) ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। আদালতের আদেশ ছাড়া এর বেশি সময় তাকে আটকে রাখা যাবে না।

কখন রিট করা যাবে: যদি পুলিশ ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়া আটকে রাখে বা কয়েক দিন ধরে বেআইনিভাবে হেফাজতে রাখে।

উদাহরণ: শুক্রবার সকালে একজনকে তুলে নেওয়া হলো এবং সোমবার সকালে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নেওয়া হলো। মাঝখানের সময়টুকু সে বেআইনি হেফাজতে ছিল।

আইনি পদক্ষেপ: এটি 'হেবিয়াস কর্পাস' (Habeas Corpus) বা বন্দি প্রদর্শন রিটের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। প্রথম ২৪ ঘণ্টার পরবর্তী সময়টুকু সংবিধান বিরোধী।

বিচার বিভাগীয় নজির: 'ফাউস্টিনা পেরেরা' মামলায় আদালত এই নীতি সমর্থন করেছেন যে, বিচার বিভাগীয় অনুমোদন ছাড়া ২৪ ঘণ্টার বেশি আটক রাখা বেআইনি ও অসাংবিধানিক।

৪. বেআইনি রিমান্ড বা পুলিশি হেফাজতের অপব্যবহার:
কারণ: অনেক সময় পুলিশ যথাযথ কারণ ছাড়াই রিমান্ড চায় বা নির্যাতন ও স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য এর অপব্যবহার করে।

কখন রিট করা যাবে: যখন যথাযথ ভিত্তি ছাড়াই রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়, রিমান্ডে নির্যাতন করা হয় বা ম্যাজিস্ট্রেট যান্ত্রিকভাবে (বিবেচনা না করে) রিমান্ড আদেশ দেন।

বিচার বিভাগীয় নজির: 'ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ' মামলায় হাইকোর্ট গ্রেপ্তার, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুরক্ষায় ১৫টি নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

৫. সাংবিধানিক সুরক্ষা না মেনে নিবর্তনমূলক আটক (Preventive Detention):
৩৩ অনুচ্ছেদে অপরাধ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে আটক রাখার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত। তবে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে অবশ্যই আটকের কারণ জানাতে হবে (জাতীয় স্বার্থে গোপন রাখা প্রয়োজন না হলে), আটকাদেশের বিরুদ্ধে আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে এবং আটক ৬ মাসের বেশি হলে 'উপদেষ্টা বোর্ড'-এর নিকট পাঠাতে হবে।

রিটের ভিত্তি: যদি উপদেষ্টা বোর্ড গঠন না করা হয় অথবা আটকের কারণগুলো অত্যন্ত "অস্পষ্ট" বা "পুরানো" হয়।

উদাহরণ: ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে একজনকে আটক করা হলো কিন্তু তাকে আটকের কারণ জানানো হলো না।

৬. নির্যাতন বা অমানবিক আচরণসহ গ্রেপ্তার বা আটক:
যদিও নির্যাতন মূলত ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের বিষয়, তবুও এটি ৩৩ অনুচ্ছেদের সুরক্ষা ব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

নজির: 'ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ' মামলায় বলা হয়েছে, হেফাজতে নির্যাতন অসাংবিধানিক এবং বেআইনি।

৭. গোপন আটক বা "গুম" (Enforced Disappearance):
ভিত্তি: যদি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাউকে গ্রেপ্তার করার পর তা অস্বীকার করে, তবে পরিবার 'হেবিয়াস কর্পাস' রিট করতে পারে। হাইকোর্ট বিভিন্ন মামলায় গোপন আটকের অভিযোগ ওঠামাত্র আটক ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন।

৮. অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত গ্রেপ্তার:
ভিত্তি: যদি কোনো যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ বা আইনি ভিত্তি ছাড়া কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা হয়রানি করতে গ্রেপ্তার করা হয়।

উদাহরণ: কোনো আইনগত অভিযোগ বা এফআইআর ছাড়াই কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করার জন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা।

বিচার বিভাগীয় নজির: 'আবদুল লতিফ' মামলায় বলা হয়েছে, আইনগত কারণ ছাড়া গ্রেপ্তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষার পরিপন্থী।

উপসংহার:
অনুচ্ছেদ ৩৩-এর অধীনে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা যেতে পারে যখন: ১) কারণ না জানিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়, ২) আইনজীবীর সুযোগ না দেওয়া হয়, ৩) ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির না করা হয়, ৪) বেআইনি রিমান্ড বা নির্যাতন করা হয়, ৫) গোপন আটক বা গুম করা হয়, ৬) অসৎ উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তার করা হয়, ৭) নিবর্তনমূলক আটকের নিয়ম লঙ্ঘন করা হয় এবং ৮) পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়।

মো. কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী।