হাইকোর্টে আপনার অধিকার ও প্রতিকার: অনুচ্ছেদ ৩১- আইনের আশ্রয় লাভ (পর্ব- ১০)

আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার: আপনার সাংবিধানিক সুরক্ষা ও প্রতিকার

আপনি কি জানেন সংবিধানের ৩১ নং অনুচ্ছেদের অধীনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আপনি কী কী অধিকার এবং প্রতিকার পাওয়ার অধিকারী? আপনি কি জানেন আইনের আশ্রয় লাভ করা এবং আইনানুযায়ী আচরণ লাভ করা আপনার অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার? আপনি কি জানেন আপনার জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম এবং সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় হাইকোর্ট সর্বদা প্রস্তুত? যদি না জেনে থাকেন, তবে চলুন আপনার অধিকারগুলো সম্পর্কে জানি এবং কীভাবে সুরক্ষিত থাকা যায় তা বুঝে নেই:

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ নং অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। এটি ঘোষণা করে যে, আইনের আশ্রয় লাভ করা এবং আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ করা প্রত্যেক নাগরিকের এবং বাংলাদেশে সাময়িকভাবে অবস্থানকারী প্রত্যেক ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার। বিশেষ করে আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যা কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটায়।

যখন কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা সরকারি কর্মকর্তা খামখেয়ালিভাবে, আইনি কর্তৃত্ব ছাড়া অথবা আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে কোনো কাজ করেন, তখন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ৩১ নং অনুচ্ছেদের নিশ্চয়তা কার্যকর করতে অনুচ্ছেদ ১০২-এর অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন।

নিচে ৩১ নং অনুচ্ছেদের অধীনে রিট দায়েরের প্রধান প্রধান কারণ বা ভিত্তিগুলো বাস্তব উদাহরণ ও বিচার বিভাগীয় নজিরসহ তুলে ধরা হলো:

৩১ নং অনুচ্ছেদের অধীনে রিট দায়েরের কারণসমূহ:

বৈধ আইনি ভিত্তি ছাড়া রাষ্ট্র বা কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ যদি কোনো "হানিকর ব্যবস্থা" গ্রহণ করে, তবে রিট দায়ের করা যেতে পারে। এর ভিত্তিগুলো নিচে দেওয়া হলো:

১. অবৈধ আটক অথবা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সুনামের হানি:
ভিত্তি: যদি কোনো ব্যক্তিকে আইনি কর্তৃত্ব ছাড়া আটক বা সীমাবদ্ধ করা হয়, তবে তা ৩১ নং অনুচ্ছেদ (এবং ৩২ নং অনুচ্ছেদ) লঙ্ঘন করে।

উদাহরণ: পুলিশ কর্তৃক আইনানুগ গ্রেপ্তার বা বৈধ কারণ ছাড়াই কাউকে আটকে রাখা।

সংবিধিবদ্ধ প্রয়োজনীয়তা অনুসরণ না করে নিবর্তনমূলক আটক (Preventive Detention) আদেশ দেওয়া।

বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগেই কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে মিডিয়ার সামনে হাজির করা এবং তাকে "অভ্যাসগত অপরাধী" হিসেবে ঘোষণা করে তার সামাজিক সম্মান নষ্ট করা।

বিচার বিভাগীয় নজির: অরুণা সেন বনাম বাংলাদেশ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেন যে, আইনগত যৌক্তিকতা ছাড়া আটক রাখা স্বাধীনতার সাংবিধানিক সুরক্ষার পরিপন্থী এবং আদালত রিট এখতিয়ারের মাধ্যমে এতে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

২. সরকারি কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালি বা অবৈধ কর্মকাণ্ড:
ভিত্তি: ৩১ নং অনুচ্ছেদ সরকারি কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার অপপ্রয়োগ থেকে নাগরিকদের রক্ষা করে। কোনো কর্তৃপক্ষ যদি আইনি ক্ষমতার বাইরে কাজ করে, তবে রিট করা যায়।

উদাহরণ: কোনো সরকারি কর্মকর্তা আইনি নোটিশ বা আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই কারো দোকান উচ্ছেদ বা ধ্বংস করলে।কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ শুনানির সুযোগ না দিয়েই খামখেয়ালিভাবে কারো ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করলে।

বিচার বিভাগীয় নজির: কুদরত-ই-এলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ মামলায় আপিল বিভাগ জোর দিয়ে বলেন যে, সকল নির্বাহী কাজ অবশ্যই কঠোরভাবে আইন অনুযায়ী হতে হবে এবং ক্ষমতার খামখেয়ালি প্রয়োগ ৩১ ও ৩২ নং অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।

৩. আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার বা সীমা লঙ্ঘন (Ultra Vires):
ভিত্তি: ৩১ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী "আইনানুযায়ী ব্যতীত" কারো ক্ষতি করা যাবে না। যদি কোনো কর্মকর্তা একটি নির্দিষ্ট আইনের বাইরে গিয়ে কাজ করেন অথবা কেবল "মৌখিক আদেশ" বা "পলিসি"র ভিত্তিতে কাজ করেন যার কোনো আইনি ভিত্তি নেই, তবে তা বাতিলযোগ্য।

উদাহরণ: কোনো পৌরসভা 'স্থানীয় সরকার আইন' অনুযায়ী পূর্ব নোটিশ বা আইনি কর্তৃত্ব ছাড়াই একটি ব্যক্তিগত ভবন গুঁড়িয়ে দিল।

৪. প্রাকৃতিক ন্যায়ের নীতি (Natural Justice) লঙ্ঘন:
"আইনানুযায়ী" কথাটির অর্থ হলো একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়া। আইন যদি নীরবও থাকে, তবুও আদালত সেখানে "কারণ দর্শানোর নোটিশ" বা শুনানির সুযোগকে বাধ্যতামূলক মনে করে।

উদাহরণ: কারণ দর্শানোর নোটিশ বা বিভাগীয় তদন্ত ছাড়াই কোনো সরকারি কর্মচারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কারো লাইসেন্স বাতিল করা।

কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষার্থীকে গোপন রিপোর্টের ভিত্তিতে বহিষ্কার করা, যেখানে তাকে অভিযোগের কপি দেওয়া হয়নি বা নিজের পক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

বিচার বিভাগীয় নজির: আবদুল লতিফ বনাম বাংলাদেশ মামলায় আপিল বিভাগ রায় দেন যে, অধিকারকে প্রভাবিত করে এমন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রাকৃতিক ন্যায়ের নীতি মেনে নিতে হবে, যা ৩১ ও ২৭ নং অনুচ্ছেদের অংশ।

৫. সম্পত্তি ও দেহের সুরক্ষা:
সম্পত্তি দখল বা শারীরিক সীমাবদ্ধতার প্রতিটি ক্ষেত্রে অবশ্যই লিখিত আইন অনুসরণ করতে হবে।

ভিত্তি: বিচারিক প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ বা "ক্রসফায়ার" (বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড) ৩১ নং অনুচ্ছেদের চরম লঙ্ঘন। এছাড়া আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কারো জমি দখল বা মালামাল বাজেয়াপ্ত করা হলে রিট করা যায়।

৬. অসৎ উদ্দেশ্যে (Mala Fide) নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত:
ভিত্তি: যখন কোনো প্রশাসনিক কাজ অসৎ উদ্দেশ্য, পক্ষপাতিত্ব বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে করা হয়।

উদাহরণ: কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক কারণে বারবার বদলি করে হয়রানি করা, অথবা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে কোনো ঠিকাদারকে ব্ল্যাকলিস্ট করা।

সুপ্রিম কোর্টের কিছু যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ:
পরিবেশ ও জীবন: ডা. মহিউদ্দিন ফারুক মামলায় আদালত বলেন, ৩১ ও ৩২ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত "জীবনের অধিকার" মানে একটি সুস্থ পরিবেশে বাঁচার অধিকার। আইন না মেনে পরিবেশের ক্ষতি করা ৩১ নং অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।

৫৪ ও ১৬৭ ধারা: ব্লাস্ট (BLAST) মামলায় আদালত রায় দেন যে, পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের ক্ষমতা অবশ্যই ৩১ নং অনুচ্ছেদের রক্ষাকবচ মেনে প্রয়োগ করতে হবে। এটি পুলিশের খেয়ালখুশি মতো ক্ষমতা প্রয়োগ নিষিদ্ধ করেছে।

হ্যান্ডক্যাপ বা হাতকড়া পরানো: আদালত রায় দিয়েছেন যে, পালানোর বা সহিংসতার স্পষ্ট ঝুঁকি না থাকলে কাউকে হাতকড়া পরিয়ে জনসমক্ষে ঘোরানো ৩১ নং অনুচ্ছেদের অধীনে তার মর্যাদা ও সুনামের পরিপন্থী।

উপসংহার:
সংবিধানের ৩১ নং অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট করা যেতে পারে যখন: ১) সরকারি কর্তৃপক্ষ খামখেয়ালি বা অবৈধ সিদ্ধান্ত নেয়, ২) প্রাকৃতিক ন্যায়ের নীতি লঙ্ঘন করা হয় (নোটিশ বা শুনানি ছাড়া), ৩) আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়া কাউকে আটক করা হয়, ৪) আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার হয়, ৫) আইনি ভিত্তি ছাড়া সুনাম নষ্ট করা হয়, ৬) আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সম্পত্তি দখল বা ধ্বংস করা হয়, এবং ৭) রাজনৈতিক বা অসৎ উদ্দেশ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৩১ নং অনুচ্ছেদ আইনের শাসন নিশ্চিত করার একটি বিস্তৃত সাংবিধানিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে এবং হাইকোর্ট বিভাগ অনুচ্ছেদ ১০২-এর মাধ্যমে এটি রক্ষা করে।

মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
এবং মৌলিক অধিকার কর্মী।