হাইকোর্টে আপনার অধিকার ও প্রতিকার: অনুচ্ছেদ ২৮- ধর্ম, বর্ণ, নারী, পুরুষ, জন্মস্থান ইত্যাদির কারণে বৈষম্য (পর্ব- ০৮)

আপনি কি জানেন যে সংবিধানের ২৮ নং অনুচ্ছেদের আলোকে আপনার মৌলিক অধিকারগুলো কী কী? আপনি কি জানেন যে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্র, কর্মসংস্থান, সরকারি সেবা বা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হলে আপনার করনীয় কী কী? ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ বা জন্মস্থানের কারণে অথবা নারী হওয়ার কারণে এই ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপনি কী করতে পারেন সে সম্পর্কে কি আপনার ধারণা আছে? কর্মসংস্থান, সরকারি সেবা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো অক্ষমতা, দায়বদ্ধতা, সীমাবদ্ধতা বা শর্তের শিকার হলে আপনার প্রতিকার পাওয়ার উপায় কী? যদি জানা না থাকে, তবে চলুন আপনার অধিকারগুলো সম্পর্কে জেনে নিই। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র বা কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ যদি ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে অথবা নারী হওয়ার কারণে কোনো বৈষম্য করে, তবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা যেতে পারে।

আপনার ধর্মের কারণে বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে, গোত্রের কারণে, বংশের কারণে, জেন্ডার ভিত্তিতে অর্থাৎ পুরুষ বা মহিলা হওয়ার কারণে এবং জন্ম স্থানের কারণে আপনাকে সরকারী-আধাসরকারী প্রতিষ্ঠানের চাকুরিতে নিয়োগ দেয়া না হয়, পদন্নোতি দেয়া না হয়, অপসারণ করা হয় বা অবসরে পাঠানো হয় কিংবা ধর্ম-গোত্র-জেন্ডারের কারণে যদি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি না নেয়, তাহলে আপনি ধর্ম-গোত্র-জেন্ডারের কারণে যেই বৈষম্যের শিকার হলেন, এক্ষেত্রে এর প্রতিকার পেতে চাইলে আপনি কোথায় যাবেন? আপনি মহামান্য হাইকোর্টে আসবেন, রিট পিটিশন দায়ের করবেন।  হাইকোর্টের কাছে যদি প্রতিয়মান হয় যে, আপনি বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, আপনার এই মৌলিক অধিকারটি ক্ষুন্ন হয়েছে, তাহলে হাইকোর্ট বিভাগ আদেশ জারী করে আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেন। 

নিচে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় ও ক্ষেত্র উল্লেখ করা হলো যেখানে রিট দায়ের করা যেতে পারে, যা বিভিন্ন উদাহরণ এবং বিচারিক নজিরের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:

উদারহরণ-১: কোন প্রতিষ্ঠান যদি নারীদের অবসরে যাওয়ার বয়স ৪৫ বছর এবং পুরুষদের অবসরে যাওয়ার বয়স ৬৫ করে অর্থাৎ ডেন্ডারের ভিত্তিতে যদি চাকুরী হতে অবসরে যাওয়ার বয়সসীমা নির্ধারণ করে তবে তা হবে লিঙ্গ বৈষম্য যা অসাংবিধানিক। এক্ষেত্রে ওই চাকুরীর কোন নারী সদস্য যদি এই বৈষম্য দূর করে সমান অধিকার পেতে চায় তাহলে তাকে মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করতে হবে। হাইকোর্টে কাছে যদি এটি প্রতিয়মান হয় যে, লিঙ্গ বৈষম্য হচ্ছে তাহলে ওই বৈষম্যকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক হিসাবে আখ্যা দিয়ে আদেশ জারী করবেন। 

উদারহরণ-২: কোন সরকারী-অধাসরকারী প্রতিষ্ঠান যদি বয়োজেষ্ঠ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদন্নোতি না দিয়ে বয়:কণিষ্ঠ, অধস্তন বা নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদন্নোতি প্রদান করেন, তাহলে ওই বয়োজেষ্ঠ্য কর্মকর্তা-কর্মচারী বৈষম্যের শিকার হলেন এবং এজন্য তিনি তাঁর এই মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন।   হাইকোর্টের কাছে যদি প্রতিয়মান হয় যে, আপনি বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, আপনার এই মৌলিক অধিকারটি ক্ষুন্ন হয়েছে, তাহলে হাইকোর্ট বিভাগ আদেশ জারী করে আপনার অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেন।   

সংবিধানের ২৮নং অনুচ্ছেদ:

Discrimination on grounds of religion, etc.

  1. (1) The State shall not discriminate against any citizen on grounds only of religion, race, caste, sex or place of birth.

(2) Women shall have equal rights with men in all spheres of the State and of public life.

(3) No citizen shall, on grounds only of religion, race, caste, sex or place of birth be subjected to any disability, liability, restriction or condition with regard to access to any place of public entertainment or resort, or admission to any educational institution.

(4) Nothing in this article shall prevent the State from making special provision in favour of women or children or for the advancement of any backward section of citizens.

 

সরকারি কর্মসংস্থানে লিঙ্গ বৈষম্য (অনুচ্ছেদ ২৮.২):

এটি রিট মামলার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। যখন একজন নারীকে চাকরি, পদোন্নতি বা এমন কোনো সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয় যা তার পুরুষ সহকর্মীরা পাচ্ছেন, তখন তা সরাসরি ২৮.২ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।

বিষয়: যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও যখন কোনো নারীকে চাকরি, পদোন্নতি বা নির্দিষ্ট পদায়ন থেকে বঞ্চিত করা হয়, অথবা যখন কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে "যৌক্তিক শ্রেণিবিভাগ" ছাড়াই কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গকে বাদ দেওয়া হয়।

হাইকোর্ট বিভাগ বিভিন্ন রায়ে মাধ্যমে বলে আসছে যে, রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারীদের সমান অধিকার রয়েছে। বিভিন্ন মামলায় আদালত এমন সব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়েছে যা শুধুমাত্র লিঙ্গের কারণে নারীদের নির্দিষ্ট ক্যাডার বা চাকরিতে যোগদানে বাধা দিয়েছিল।

উদাহরণ-১: সরকারি চাকরিতে "পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর" বা "প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক" পদের জন্য কোনো বিজ্ঞপ্তিতে যদি বলা হয় যে শুধুমাত্র পুরুষরা আবেদনের যোগ্য, অথচ সেই কাজটি নারীদের জন্য শারীরিকভাবে অসম্ভব বলে প্রমাণ করা না যায়।

উদাহরণ-২: কোনো সরকারি দপ্তর থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলো যে "নাইট শিফট সুপারভাইজার" পদে শুধু পুরুষরা যোগ্য, এই ধারণা থেকে যে নারীরা রাতে কাজ করতে পারবে না।

বিচারিক নজির: বাংলাদেশ বনাম জাকিয়া আক্তার মামলায় আদালত জোর দিয়ে বলেন যে, রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারীদের সমান অধিকার রয়েছে। শুধুমাত্র লিঙ্গের কারণে নারীদের কোনো পেশায় বাধা দেয় এমন যেকোনো প্রশাসনিক নিয়ম বাতিল বলে গণ্য হবে।

 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য (অনুচ্ছেদ ২৮.৩):

ধর্ম, বর্ণ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে কোনো নাগরিককে রাষ্ট্র পরিচালিত বা রাষ্ট্রীয় অনুদানপ্রাপ্ত স্কুল/কলেজে ভর্তি হতে বাধা দেওয়া যাবে না। যখন কোনো রাষ্ট্র পরিচালিত বা অনুদানপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই ভিত্তিগুলোতে কোনো শিক্ষার্থীকে ভর্তি করতে অস্বীকার করে, তখন ওই শিক্ষার্থী বৈষম্যমূলক নিয়ম, নোটিশ বা প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন।

উদাহরণ: কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় যদি এমন "জেলা কোটা" প্রয়োগ করে যা অত্যন্ত অসম, যেখানে কোনো বৈধ "পিছিয়ে পড়া জনপদ" এর যুক্তি ছাড়াই এক জেলার উচ্চ নম্বরধারী শিক্ষার্থীকে বাদ দিয়ে অন্য জেলার উল্লেখযোগ্য কম নম্বরধারী শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়।

বিচারিক নজির: আদালত বারবার বলেছে যে ভর্তির মানদণ্ড অবশ্যই যৌক্তিক হতে হবে। যদি কোনো শিক্ষার্থী যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও "নিষিদ্ধ কোনো কারণে" (যেমন: ধর্ম) প্রত্যাখ্যাত হন, তবে প্রতিষ্ঠানকে ভর্তি নিতে বাধ্য করতে 'রিট অফ ম্যানডামাস' (Writ of Mandamus) দায়ের করা যেতে পারে।

বিচারিক নজির: আজিজুল হক বনাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মামলায় আদালত ভর্তির মানদণ্ডের বৈধতা নিয়ে আলোকপাত করেন। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় যে, রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য "বিশেষ বিধান" (অনুচ্ছেদ ২৮.৪) করতে পারলেও, কোনো যৌক্তিক যোগসূত্র ছাড়া শুধুমাত্র "জন্মস্থান" বা "ধর্মের" ভিত্তিতে কোনো বৈষম্যমূলক মানদণ্ড তৈরি করলে তা বাতিলযোগ্য।

 

বৈষম্যমূলক আইন বা সংবিধিবদ্ধ বিধিমালা:

যদি কোনো আইন, বিধি, প্রবিধান, প্রজ্ঞাপন বা কোনো বিধান নাগরিকদের মধ্যে শুধুমাত্র ২৮ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত কারণগুলোর ভিত্তিতে পার্থক্য তৈরি করে, তবে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দাখিল করে সেটিকে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।

উদাহরণ-১: এমন একটি আইন যেখানে বলা হয়েছে যে নারী সরকারি কর্মচারীদের ৫৭ বছর বয়সে অবসরে যেতে হবে, যেখানে একই পদের পুরুষ কর্মচারীরা ৫৯ বছর পর্যন্ত কাজ করতে পারবেন।

বাস্তব নজির: একটি মামলায় আদালত এমন একটি নিয়ম বাতিল করে দিয়েছিলেন যেখানে এয়ার হোস্টেসদের প্রথম সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হতো। আদালত এটিকে "মাতৃত্বের অবমাননা" এবং সমঅধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।"

মোঃ কামরুজ্জামান

অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
এবং মৌলিক অধিকার কর্মী।