হাইকোর্টে আপনার অধিকার ও প্রতিকার: অনুচ্ছেদ ২৬- মৌলিক অধিকারের সহিত অসমঞ্জস আইন বাতিল (পর্ব- ০৬)
আপনি কি জানেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে অনুচ্ছেদ ২৬ এর অধীনে আপনার কী কী মৌলিক অধিকার রয়েছে? যদি না জানেন, তবে চলুন জেনে নেই; কারণ এটি আপনার ব্যক্তিগত মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন যা প্রয়োগের জন্য আপনি Writ Petition দায়ের করার মাধ্যমে আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৬-এর অধীনে, হাইকোর্ট বিভাগ জনগণের অধিকারের "অভিভাবক" (Guardian) হিসেবে কাজ করে। অনুচ্ছেদ ২৬ মূলত সেই সারবত্তা বা ভিত্তি প্রদান করে যে, কোনো আইন যদি মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে তা বাতিল বা void হবে। অনুচ্ছেদ ২৬-এর অধীনে যেকোনো বিষয়, যেখানে কোনো আইন. বিধি বা সরকারি পদক্ষেপ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭–৪৪ বর্ণিত অধিকারগুলোতে হস্তক্ষেপ করে, সেখানে একটি রীট মামলা দায়ের করা যেতে পারে। অতএব, যখন কোনো আইন, রাষ্ট্রের কার্যাবলি বা কোনো কর্তৃপক্ষ মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে, তখন একজন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি (aggrieved person) বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০২-এর অধীনে Writ Petition দায়েরের মাধ্যমে হাই কোর্ট বিভাগে প্রতিকার চাইতে পারেন।
অনুচ্ছেদ ২৬:
২৬। (১) এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসামঞ্জস্য সকল প্রচলিত আইন এই সংবিধান প্রবর্তনের সময় হইতে সেই অসামঞ্জস্যের সীমা পর্যন্ত বাতিল (void) হইয়া যাইবে। (২) রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্যের সীমা পর্যন্ত বাতিল (void) হইয়া যাইবে। (৩) সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রণীত সংশোধনের ক্ষেত্রে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই প্রযোজ্য হইবে না।
বর্তমানে অনুচ্ছেদ ২৬-এর অধীন যেসব নির্দিষ্ট বিষয়ে Writ Petition দায়ের করা যেতে পারে, নির্দিষ্ট বিষয় এবং উদাহরণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. আইনের বৈধতা বা সাংবিধানিকতাকে চ্যালেঞ্জ করা (Ultra Vires):
একটি আইন, ধারা বা বিধির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে দুই ধরনের আইনের বিরুদ্ধে Writ Petition দায়ের করা যেতে পারে: ১) প্রচলিত আইন (existing laws) এবং ২) নতুন আইন (new laws)।
- Existing laws- অনুচ্ছেদ ২৬.১: ঔপনিবেশিক বা ১৯৭২-পূর্ব আইন যা এখনও কার্যকর কিন্তু সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে, সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা। মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সকল প্রচলিত আইন সেই অসামঞ্জস্যের সীমা পর্যন্ত বাতিল (void) হবে।
- ভিত্তি (Ground): আইনটি যখন পাস হয়েছিল (যেমন ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলে) তখন তা বৈধ ছিল, কিন্তু বর্তমানে তা অসাংবিধানিক।
- উদাহরণ: যদি কোনো আইন ক্ষতিপূরণ ছাড়াই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অনুমতি দেয়, তবে সেটিকে অনুচ্ছেদ ৪২ (সম্পত্তির অধিকার)-এর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।
- উদাহরণ: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশোধন আইন ২০১৩-এ সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য সরকারের পূর্বানুমতির প্রয়োজন ছিল। HRPB vs. Bangladesh মামলায় হাই কোর্ট বিভাগ এই বিধানটিকে বাতিল (void) ঘোষণা করে, কারণ এটি অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা) লঙ্ঘন করেছিল; এটি সরকারি কর্মচারীদের একটি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি হিসেবে তৈরি করেছিল যারা অন্যদের চেয়ে "বেশি সমান" ছিল।
- New laws- অনুচ্ছেদ ২৬.২: সংসদ কর্তৃক পাসকৃত কোনো আইন যা সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে, তাকে চ্যালেঞ্জ করা যায়। রাষ্ট্র এই ভাগের কোনো বিধানের সাথে অসামঞ্জস্য কোনো আইন প্রণয়ন করবে না এবং অনুরূপ কোনো আইন প্রণীত হলে তা অসামঞ্জস্যের সীমা পর্যন্ত বাতিল (void) হবে, এই মর্মে রীট মামলা দায়ের করা যায়।
- ভিত্তি (Ground): সংসদ একটি সংরক্ষিত অধিকার খর্ব করার মাধ্যমে তার আইন প্রণয়নের সীমা লঙ্ঘন করেছে।
- উদাহরণ: ১৬শ সংশোধনী মামলায়, সুপ্রিম কোর্ট উক্ত সংশোধনীকে বাতিল ঘোষণা করে কারণ এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করেছিল, যা মৌলিক অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত সংবিধানের একটি মৌলিক কাঠামো (basic structure)।
- উদাহরণ: সরকার একটি "ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন"-এর এমন ধারা পাস করল যা কোনো সাংবাদিকসহ যে কাউকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারের অনুমতি দেয়। এটি অনুচ্ছেদ ৩৯ (চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা) লঙ্ঘন করে। একজন সাংবাদিক অনুচ্ছেদ ২৬-এর অধীনে সেই নির্দিষ্ট ধারাটি বাতিল ঘোষণার জন্য Writ দায়ের করতে পারেন।
২. "অর্পিত আইন" (Delegated Legislation) চ্যালেঞ্জ করা (বিধি, অধ্যাদেশ, প্রজ্ঞাপন):
অনুচ্ছেদ ১৫২-এর অধীনে "আইন"-এর সংজ্ঞায় বিধি (rules), প্রবিধান (regulations), উপ-আইন (bye-laws) এবং প্রজ্ঞাপন (notifications) অন্তর্ভুক্ত। যদি কোনো সরকারি পরিপত্র বা নীতি মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে, তবে তাকে চ্যালেঞ্জ করা যায়।
- ভিত্তি (Ground): নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার অপব্যবহার বা স্বেচ্ছাচারী প্রয়োগ।
- উদাহরণ: একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন (গেজেট) কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই নাগরিকদের একটি নির্দিষ্ট অংশকে চাকরিতে আবেদন করা থেকে বিরত রাখে। এটি অনুচ্ছেদ ২৯ (সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা) লঙ্ঘন করে। সেই প্রজ্ঞাপন বাতিলের জন্য Writ of Mandamus বা Writ of Certiorari দায়ের করা যেতে পারে।
৩. স্বেচ্ছাচারী প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও বৈষম্য:
অনুচ্ছেদ ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা)-এর অধীনে প্রায়শই Writ দায়ের করা হয় যখন রাষ্ট্র বৈষম্যমূলক বা স্বেচ্ছাচারীভাবে কোনো আইন প্রয়োগ করে।
- চাকরি সংক্রান্ত বিষয় (Service Matters): যখন কোনো সরকারি কর্মচারীকে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত বা বরখাস্ত করা হয়।
- টেন্ডার বা চুক্তি প্রদান: যখন সরকার এমন কোনো পক্ষকে পাবলিক কন্ট্রাক্ট প্রদান করে যারা শর্ত পূরণ করে না, যার ফলে অন্যান্য যোগ্য দরদাতাদের সমান আচরণের অধিকার লঙ্ঘিত হয়।
- উদাহরণ: যদি কোনো আইন কেবল নির্দিষ্ট শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করার আগে "পূর্বানুমতি" বা prior sanction-এর বিধান রাখে, তবে সেটিকে "অযৌক্তিক শ্রেণিবিভাগ" (unreasonable classification) তৈরির দায়ে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।
৪. সমতা এবং বৈষম্যহীনতার লঙ্ঘন:
যখন রাষ্ট্র কোনো আইনগত ন্যায্যতা ছাড়াই একই অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের সাথে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে—যেমন সরকারি চাকরিতে নিয়োগে বৈষম্য, আইনগত ভিত্তি ছাড়াই নির্দিষ্ট গ্রুপকে সরকারি সুবিধা প্রদান বা অনুচ্ছেদ ২৭ ও ২৮-এর লঙ্ঘন করে সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ—তখন এগুলোর বিরুদ্ধে Writ Petition দায়ের করা যেতে পারে।
৫. আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার বা যথাযথ প্রক্রিয়ার (Due Process) অস্বীকার:
যখন প্রশাসনিক বা সরকারি কার্যক্রম আইনের শাসন লঙ্ঘন করে—যেমন শুনানি ছাড়াই লাইসেন্স বাতিল করা, অধিকার ক্ষুণ্ণকারী স্বেচ্ছাচারী সরকারি আদেশ বা অনুচ্ছেদ ৩১ (আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার) লঙ্ঘন করে আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়াই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ—তখন এগুলোর বিরুদ্ধে Writ Petition দায়ের করা যায়।
৬. সরকারি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এক্তিয়ার বহির্ভূত (Without Jurisdiction) পদক্ষেপ:
যখন কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ তার আইনগত ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কাজ করে, তখন সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে Writ of Certiorari (অবৈধ সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য) বা Writ of Prohibition (অবৈধ কার্যক্রম বন্ধের জন্য) দায়ের করা যেতে পারে।
মো: কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
এবং
মৌলিক অধিকার কর্মী