বাণিজ্যিক আদালতে মামলা (পর্ব-০৮): ফ্র্যাঞ্চাইজ চুক্তি (Franchising agreements) সংক্রান্তে বাণিজ্যিক বিরোধ

বর্তমান যুগে ব্যবসা সম্প্রসারণের অন্যতম জনপ্রিয় ও কার্যকর মাধ্যম হলো 'ফ্র্যাঞ্চাইজিং' (Franchising)। বিখ্যাত দেশীয় বা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো তাদের নাম, ট্রেডমার্ক এবং ব্যবসায়িক মডেল ব্যবহারের অধিকার অন্য ব্যবসায়ীদের (ফ্র্যাঞ্চাইজি) দিয়ে থাকে, যার বিনিময়ে তারা ফ্র্যাঞ্চাইজ ফি এবং রয়্যালটি পায়।

যেহেতু ফ্র্যাঞ্চাইজ চুক্তিতে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ, ব্র্যান্ডের সুনাম এবং মেধা সম্পদের (Intellectual Property) বিষয় জড়িত থাকে, তাই এর বিরোধগুলো অত্যন্ত জটিল হয়। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(৭)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, "ফ্র্যাঞ্চাইজ চুক্তি (Franchising agreements)" থেকে উদ্ভূত যেকোনো বিরোধ 'বাণিজ্যিক বিরোধ' হিসেবে গণ্য হবে এবং বাণিজ্যিক আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।

বাংলাদেশে ফ্র্যাঞ্চাইজিং কোনো নির্দিষ্ট একক আইনের অধীনে পরিচালিত হতো না। এটি মূলত ১৮৭২ সালের চুক্তি আইন (Contract Act, 1872), ২০০৯ সালের ট্রেডমার্ক আইন এবং ২০১২ সালের প্রতিযোগিতা আইনের একটি সম্মিলিত প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল ছিল । তবে বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ আসার ফলে ফ্র্যাঞ্চাইজিং এখন একটি সুনির্দিষ্ট বিচারিক কাঠামোর অধীনে এসেছে।

এই ধারার অধীনে মামলা দায়ের করার প্রধান গ্রাউন্ড বা ক্ষেত্রগুলো এবং সেগুলোর একাধিক বাস্তব উদাহরণ নিচে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো:

১. রয়্যালটি (Royalty) এবং ফ্র্যাঞ্চাইজ ফি পরিশোধ সংক্রান্ত বিরোধ:
ফ্র্যাঞ্চাইজ চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ফ্র্যাঞ্চাইজিকে (যিনি ব্র্যান্ড নিয়েছেন) নির্দিষ্ট সময় পরপর মোট বিক্রির একটি অংশ 'রয়্যালটি' হিসেবে ফ্র্যাঞ্চাইজরকে (মূল মালিক) দিতে হয়। এই ফি পরিশোধ নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিরোধ হয়।

ফ্র্যাঞ্চাইজ সম্পর্কের অন্যতম প্রধান বিরোধ হলো রয়্যালটি বা লাইসেন্স ফি প্রদান। চুক্তিতে সাধারণত ফ্র্যাঞ্চাইজিকে তার মোট বিক্রির (Gross Sales) একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রতি মাসে বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ফ্র্যাঞ্চাইজরকে প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দিতে হয় । বিরোধ তখনই তৈরি হয় যখন ‘মোট বিক্রি’ বা ‘গ্রস সেলস’-এর সংজ্ঞা নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে দ্বিমত সৃষ্টি হয়।এই ধরণের বিরোধের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় যে, ফ্র্যাঞ্চাইজি তার প্রকৃত আয় গোপন করছে বা ভ্যাট, ডিসকাউন্ট এবং হোম ডেলিভারি চার্জ বাদ দিয়ে রয়্যালটি গণনা করছে । আবার অনেক ক্ষেত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজর কর্তৃক অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত ফি বা লুকায়িত চার্জ আরোপ করার অভিযোগ ওঠে।

বাস্তব উদাহরণ ১ (বিক্রির তথ্য গোপন করে রয়্যালটি ফাঁকি):
প্রেক্ষাপট: 'ক' নামক একটি বিখ্যাত কফি ব্র্যান্ড তাদের একটি শাখার ফ্র্যাঞ্চাইজি দেয় 'খ' এন্টারপ্রাইজকে। চুক্তি অনুযায়ী 'খ' প্রতি মাসের মোট বিক্রির ৫% রয়্যালটি দেবে। কিন্তু 'খ' তাদের নিজস্ব একটি পয়েন্ট অব সেলস (POS) সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিক্রির অর্ধেক হিসাব গোপন করে এবং কম রয়্যালটি প্রদান করে। অডিট করার পর 'ক' ব্র্যান্ড বিষয়টি ধরতে পারে।

মামলার কারণ: চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন এবং রয়্যালটি ফাঁকি। 'ক' ব্র্যান্ড বকেয়া রয়্যালটি আদায় এবং চুক্তি বাতিলের জন্য বাণিজ্যিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (বার্ষিক নবায়ন ফি প্রদানে অস্বীকৃতি):
প্রেক্ষাপট: একটি আন্তর্জাতিক চেইন সুপারশপ তাদের বাংলাদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রতি বছর ১০ লক্ষ টাকা রিনিউয়াল ফি (Renewal Fee) দিতে বলে। কিন্তু বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে—এই অজুহাত দেখিয়ে ফি দিতে অস্বীকৃতি জানায়, অথচ তারা ব্র্যান্ডের নাম ঠিকই ব্যবহার করতে থাকে।

মামলার কারণ: ফ্র্যাঞ্চাইজ ফি প্রদানে ব্যর্থতা। মূল ব্র্যান্ড তাদের পাওনা টাকা আদায়ের জন্য এই ধারায় মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৩: 
একটি আন্তর্জাতিক ফাস্ট-ফুড চেইন বাংলাদেশে তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজিকে প্রতি মাসে ৬% রয়্যালটি প্রদানের শর্তে নিয়োগ দেয়। তিন বছর পর ফ্র্যাঞ্চাইজর লক্ষ্য করে যে, ফ্র্যাঞ্চাইজি তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রাপ্ত অর্ডারের আয়কে মোট বিক্রির অন্তর্ভুক্ত করছে না। ফ্র্যাঞ্চাইজির দাবি ছিল যে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কমিশন দেওয়ার পর যে অর্থ থাকে তাই রয়্যালটির জন্য বিবেচ্য। কিন্তু চুক্তির ভাষা অনুযায়ী ‘মোট বিক্রি’ বলতে কোনো কাটছাঁট ছাড়াই সরাসরি বিক্রয়মূল্যকে বোঝায়। এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(৭) ধারার অধীনে ফ্র্যাঞ্চাইজর বকেয়া রয়্যালটি আদায়ের জন্য মামলা দায়ের করতে পারে।

বাস্তব উদাহরণ ৪: একটি পোশাক ব্র্যান্ডের ফ্র্যাঞ্চাইজি অভিযোগ করে যে, তাদের কাছ থেকে বার্ষিক ২% মার্কেটিং ফি নেওয়া হচ্ছে কিন্তু ব্র্যান্ডটি গত দুই বছরে বাংলাদেশে কোনো প্রচারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেনি। ফ্র্যাঞ্চাইজি এই গ্রাউন্ডে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারে যে, ফ্র্যাঞ্চাইজর তার চুক্তিবদ্ধ পরিষেবা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে, যা রয়্যালটি প্রদানের আবশ্যকতাকে প্রভাবিত করে ।

ব্র্যান্ডের মান, সিক্রেট রেসিপি ও নির্দেশিকা (SOP) লঙ্ঘন:
ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো সব শাখায় একই মান ও স্বাদ (Quality and Taste) বজায় রাখা। ফ্র্যাঞ্চাইজি যদি মূল কোম্পানির স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) না মানে, তবে ব্র্যান্ডের সুনাম নষ্ট হয়।

বাস্তব উদাহরণ ২.১ (নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার):
প্রেক্ষাপট: একটি জনপ্রিয় দেশীয় 'কাচ্চি বিরিয়ানি' ব্র্যান্ড সিলেটে তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজি দেয়। চুক্তিতে স্পষ্ট বলা ছিল যে, মাংস ও বিশেষ মসলা প্রধান শাখা থেকে নিতে হবে। কিন্তু সিলেটের ফ্র্যাঞ্চাইজি বেশি লাভের আশায় স্থানীয় বাজার থেকে নিম্নমানের মাংস ও সাধারণ মসলা ব্যবহার শুরু করে, যার ফলে ক্রেতারা বাজে রিভিও দেওয়া শুরু করে এবং ব্র্যান্ডের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়।

মামলার কারণ: ব্র্যান্ড ভ্যালু নষ্ট করা এবং কোয়ালিটি কন্ট্রোল (Quality Control) শর্তের লঙ্ঘন। মূল কোম্পানি ক্ষতিপূরণ এবং ওই শাখা বন্ধের নির্দেশ চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২.২ (অনুমোদনহীন ইন্টেরিয়র বা লোগো পরিবর্তন):
প্রেক্ষাপট: একটি গ্লোবাল লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড তাদের শোরুমের একটি নির্দিষ্ট ডিজাইন (Global Design Standard) ঠিক করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের এক ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক মূল কোম্পানির কোনো অনুমোদন না নিয়েই শোরুমের কালার থিম এবং লোগোর স্টাইল পরিবর্তন করে ফেলে।

মামলার কারণ: ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি এবং ডেকোরেশন গাইডলাইন লঙ্ঘন। মূল কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে।

ব্র্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড এবং মান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিরোধ (Quality Control):
ফ্র্যাঞ্চাইজিং ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো ব্র্যান্ডের একরূপতা এবং গুণগত মান। ফ্র্যাঞ্চাইজি যদি দোকানের সাজসজ্জা, কর্মীদের পোশাক, বা খাবারের মানের ক্ষেত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজরের দেওয়া গাইডলাইন অনুসরণ না করে, তবে তা ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ফ্র্যাঞ্চাইজর প্রায়ই এই গ্রাউন্ডে চুক্তি বাতিল বা জরিমানা আরোপ করে থাকে।অন্যদিকে, ফ্র্যাঞ্চাইজি অনেক সময় অভিযোগ করে যে, ফ্র্যাঞ্চাইজর তাকে এমন সব ব্যয়বহুল সরঞ্জাম কিনতে বাধ্য করছে যা অপ্রয়োজনীয় বা অত্যন্ত উচ্চমূল্যের ।

বাস্তব উদাহরণ: 
বাংলাদেশে একটি জনপ্রিয় আইসক্রিম পার্লারের ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তিতে উল্লেখ ছিল যে, শুধুমাত্র ফ্র্যাঞ্চাইজরের অনুমোদিত কারখানা থেকে দুধ ও ফ্লেভার সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু খরচ কমাতে ফ্র্যাঞ্চাইজি স্থানীয় বাজার থেকে নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার শুরু করে, যা গ্রাহকদের অভিযোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফ্র্যাঞ্চাইজর পরিদর্শন করে এই অভিযোগ সত্য প্রমাণ করে। এখন ফ্র্যাঞ্চাইজর বাণিজ্যিক আদালতে এই গ্রাউন্ডে মামলা করতে পারে যে, ফ্র্যাঞ্চাইজি চুক্তির মৌলিক শর্ত (Material Breach) লঙ্ঘন করে ব্র্যান্ডের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে ।

আঞ্চলিক এখতিয়ার, এলাকাভিত্তিক অধিকার ও সীমানা লঙ্ঘন (Territorial Disputes/Encroachment):
সাধারণত ফ্র্যাঞ্চাইজ চুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট এলাকার (যেমন- ধানমন্ডি বা গুলশান) জন্য একজনকে এক্সক্লুসিভ অধিকার দেওয়া হয়, যেন একই ব্র্যান্ডের অন্য কোনো শাখা ওই এলাকায় ব্যবসা নষ্ট করতে না পারে।

অধিকাংশ ফ্র্যাঞ্চাইজ চুক্তিতে ফ্র্যাঞ্চাইজিকে একটি নির্দিষ্ট এলাকার (Territory) জন্য একচেটিয়া বা সংরক্ষিত অধিকার প্রদান করা হয়। বিরোধের সৃষ্টি হয় যখন ফ্র্যাঞ্চাইজর নিজেই সেই এলাকায় পণ্য বিক্রি শুরু করে অথবা খুব কাছাকাছি অন্য কাউকে ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রদান করে। একে ব্যবসায়িক পরিভাষায় ‘এনক্রোচমেন্ট’বা সীমানা লঙ্ঘন বলা হয় ।

বিশেষ করে বর্তমানে ই-কমার্স বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রসারের ফলে ভৌগোলিক সীমানার ধারণা কিছুটা ধোঁয়াশাপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যদি কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি ঢাকার গুলশান এলাকায় এক্সক্লুসিভ রাইটস পায়, এবং ফ্র্যাঞ্চাইজর যদি তার কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইট থেকে গুলশান এলাকার ক্রেতাদের কাছে সরাসরি পণ্য ডেলিভারি দেয়, তবে তা চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে বাণিজ্যিক আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে ।

বাস্তব উদাহরণ ১ (মূল কোম্পানি কর্তৃক এক্সক্লুসিভিটি লঙ্ঘন):
প্রেক্ষাপট: 'গ' ট্রেডার্স একটি পিজ্জা ব্র্যান্ডের কাছ থেকে 'উত্তরা মডেল টাউন' এলাকার এক্সক্লুসিভ ফ্র্যাঞ্চাইজি নেয়। কিন্তু এক বছর পর মূল পিজ্জা কোম্পানি বেশি টাকার লোভে উত্তরাতে অন্য একজনকে আরেকটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দিয়ে দেয়, যার ফলে 'গ' ট্রেডার্সের বিক্রি অর্ধেকে নেমে আসে।

মামলার কারণ: এক্সক্লুসিভ টেরিটরি (Territorial Exclusivity) শর্তের লঙ্ঘন। 'গ' ট্রেডার্স নতুন শাখাটির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির জন্য মূল কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ২ (ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তৃক অন্য এলাকায় পণ্য বিক্রি):
প্রেক্ষাপট: একটি ইলেকট্রনিক্স ব্র্যান্ড 'ঘ' কোম্পানিকে শুধু 'চট্টগ্রাম বিভাগের' জন্য ডিস্ট্রিবিউশন ও ফ্র্যাঞ্চাইজ অধিকার দেয়। কিন্তু 'ঘ' কোম্পানি গোপনে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন ডিলারের কাছে পাইকারি দামে পণ্য বিক্রি শুরু করে, যা ঢাকার ফ্র্যাঞ্চাইজির ব্যবসায়িক ক্ষতি করে।

মামলার কারণ: নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার বাইরে গিয়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা (Cross-border selling)।

বাস্তব উদাহরণ ৩: 
একটি কফি চেইন ব্র্যান্ড চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ এলাকায় একজন ব্যবসায়ীকে এক্সক্লুসিভ ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রদান করে। কিন্তু এক বছর পর ফ্র্যাঞ্চাইজর নাসিরাবাদের ৫০০ মিটারের মধ্যেই একটি কর্পোরেট শোরুম চালু করে। ফ্র্যাঞ্চাইজি দাবি করে যে, এই নতুন শোরুমের ফলে তার দোকানের বিক্রি ৩০% কমে গেছে। এক্ষেত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজি বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ২(ঘ)(৭) ধারার অধীনে ওই নতুন শোরুম বন্ধ করার জন্য ‘ইনজাংশন’বা নিষেধাজ্ঞার মামলা দায়ের করতে পারে ।

৪. অবৈধভাবে চুক্তি বাতিল এবং ট্রেডমার্কের অপব্যবহার (Termination and IP Misuse):
অনেক সময় ফ্র্যাঞ্চাইজ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বা চুক্তি বাতিল হওয়ার পরও ফ্র্যাঞ্চাইজি মূল কোম্পানির নাম বা লোগো ব্যবহার করতে থাকে, যা সরাসরি মেধা সম্পদের (IP) লঙ্ঘন।

বাস্তব উদাহরণ ৪.১ (চুক্তি শেষেও ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার):
প্রেক্ষাপট: একটি বেসরকারি স্কুলের ফ্র্যাঞ্চাইজ চুক্তির মেয়াদ ৫ বছর পর শেষ হয়ে যায় এবং দুই পক্ষ চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের সাইনবোর্ড থেকে ওই বিখ্যাত স্কুলের নাম ও লোগো সরায় না এবং আগের নামেই নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে থাকে।

মামলার কারণ: মেধা সম্পদ (Intellectual Property) বা ট্রেডমার্কের অননুমোদিত ব্যবহার ও জালিয়াতি। মূল স্কুল কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে নাম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা (Injunction) চেয়ে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৪.২ (নোটিশ ছাড়াই আকস্মিক চুক্তি বাতিল):
প্রেক্ষাপট: 'ঙ' ফ্যাশন হাউস একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সাথে ১০ বছরের ফ্র্যাঞ্চাইজ চুক্তি করে এবং শোরুম সাজাতে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। ২ বছর পর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডটি কোনো যৌক্তিক কারণ এবং পূর্ব নোটিশ ছাড়াই (Wrongful Termination) ই-মেইলের মাধ্যমে চুক্তি বাতিল ঘোষণা করে।

মামলার কারণ: চুক্তির অন্যায্য ও বেআইনি বাতিলকরণ। 'ঙ' ফ্যাশন হাউস তাদের বিশাল বিনিয়োগের ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাণিজ্যিক আদালতে যেতে পারবে।

৫. প্রতিশ্রুত সহায়তা ও প্রশিক্ষণ প্রদানে ব্যর্থতা (Failure to Provide Support):
ফ্র্যাঞ্চাইজ চুক্তিতে ফ্র্যাঞ্চাইজর বাধ্য থাকে ফ্র্যাঞ্চাইজিকে ব্যবসা পরিচালনার জন্য সফটওয়্যার, মার্কেটিং সাপোর্ট এবং স্টাফদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য।

বাস্তব উদাহরণ ৫.১ (প্রশিক্ষণ ও সফটওয়্যার না দেওয়া):
প্রেক্ষাপট: একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার চেইন তাদের এক ফ্র্যাঞ্চাইজিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা প্যাথলজিস্টদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং সেন্ট্রাল রিপোর্টিং সফটওয়্যার দেবে। কিন্তু শাখা উদ্বোধনের ৬ মাস পরও মূল কোম্পানি কোনো সফটওয়্যার বা প্রশিক্ষণ দেয়নি, ফলে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি রোগী হারাতে থাকে।

মামলার কারণ: প্রতিশ্রুত ব্যবসায়িক সহায়তা (Business Support) প্রদানে ব্যর্থতা। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করতে পারবে।

বাস্তব উদাহরণ ৫.২ (সাপ্লাই চেইন বা কাঁচামাল সরবরাহে ব্যর্থতা):
প্রেক্ষাপট: একটি ফ্রায়েড চিকেন ফ্র্যাঞ্চাইজিতে চুক্তির শর্ত ছিল যে মূল কোম্পানি প্রতিদিন সকালের মধ্যে ফ্রেশ চিকেন সাপ্লাই দেবে। কিন্তু মূল কোম্পানির লজিস্টিক সমস্যার কারণে সপ্তাহে তিন দিনই চিকেন পৌঁছায় না, ফলে ফ্র্যাঞ্চাইজির অপারেশন বন্ধ রাখতে হয়।

মামলার কারণ: সাপ্লাই চেইন পরিচালনায় চুক্তির বরখেলাপ।

ভুল তথ্য প্রদান ও প্ররোচনা (Misrepresentation and Fraud):
ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসায় আসার আগে ফ্র্যাঞ্চাইজর অনেক সময় অত্যন্ত উজ্জ্বল আর্থিক চিত্র তুলে ধরে। যদি দেখা যায় যে, ফ্র্যাঞ্চাইজর জেনেশুনে ভুল ডাটা, অবাস্তব প্রজেকশন বা গোপনীয় তথ্য লুকিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিকে চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়েছে, তবে তাকে ‘ফ্রড ইন দ্য ইনডুসমেন্ট’ (Fraud in the inducement) বলা হয়।

বাস্তব উদাহরণ: 
একটি নতুন ফিটনেস চেইন দাবি করল যে তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজি নিলে মাসে অন্তত ৫০ লক্ষ টাকা নিট মুনাফা হবে। কিন্তু ব্যবসা শুরু করে ফ্র্যাঞ্চাইজি দেখল যে এলাকার জনতাত্ত্বিক কাঠামো অনুযায়ী ৫ লক্ষ টাকা লাভ করাও কঠিন। ফ্র্যাঞ্চাইজি যদি প্রমাণ করতে পারে যে ফ্র্যাঞ্চাইজর জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাকে ২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে প্ররোচিত করেছে, তবে সে বাণিজ্যিক আদালতে চুক্তি বাতিল এবং পূর্ণ বিনিয়োগ ফেরত চেয়ে মামলা করতে পারে ।

চুক্তি সমাপ্তি ও নবায়ন সংক্রান্ত বিরোধ (Termination and Renewal):
এটি সম্ভবত ফ্র্যাঞ্চাইজিংয়ের সবচেয়ে জটিল বিরোধের ক্ষেত্র। ফ্র্যাঞ্চাইজি সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী লাভের আশা করে। যদি ফ্র্যাঞ্চাইজর যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে চুক্তি বাতিল করে বা মেয়াদ শেষে নবায়নে অস্বীকার করে, তবে ফ্র্যাঞ্চাইজির বিশাল বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে। 

বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর অধীনে এই ধরণের মামলায় সাধারণত ‘অন্যায্য সমাপ্তি’ (Wrongful Termination) এবং ‘গুড ফেথ’ বা সৎ বিশ্বাসের অভাবের গ্রাউন্ডে মামলা করা হয় ।

বাস্তব উদাহরণ: 
একটি ডেন্টাল ক্লিনিক ফ্র্যাঞ্চাইজি ৫ বছরের জন্য চুক্তি করেছিল। ৪ বছর পর ফ্র্যাঞ্চাইজর কোনো নোটিশ ছাড়াই চুক্তি বাতিল করে দেয়, কারণ তারা ওই এলাকায় নিজস্ব কর্পোরেট শাখা খুলতে চায়। চুক্তিতে শর্ত ছিল যে, গুরুতর অপরাধ ছাড়া অন্তত ৯০ দিনের নোটিশ দিতে হবে। এক্ষেত্রে ফ্র্যাঞ্চাইজি বাণিজ্যিক আদালতে এই গ্রাউন্ডে মামলা করতে পারে যে, চুক্তি বাতিলের পদ্ধতি বেআইনি ছিল এবং তাকে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করা হয়েছে ।


উপসংহার:
বাণিজ্যিক আদালত আইন, ২০২৬ এর ধারা ২(ঘ)(৭) ফ্র্যাঞ্চাইজ ব্যবসা খাতের জন্য একটি অত্যন্ত যুগোপযোগী আইন। এর ফলে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজি দিতে আরও বেশি নিরাপদ বোধ করবে, কারণ তারা জানে যে তাদের ট্রেডমার্ক বা রয়্যালটি নিয়ে কোনো বিরোধ হলে বাণিজ্যিক আদালতের মাধ্যমে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব। একইভাবে, স্থানীয় ফ্র্যাঞ্চাইজিরাও মূল কোম্পানির কোনো অন্যায্য চুক্তি বাতিলের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা পাবে।


মোঃ কামরুজ্জামান
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
ফোন: +8801771599577
ইমেইল: lawyer.kamruzzaman@gmail.com